নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ রচিত ‘সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা’ অনূদিত বাংলা সংস্করণ – একটি পর্যালোচনা…….
– মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
– মাসিক আল-কাউসার ২০০৫ আগস্ট
(প্রথম পর্ব)
————————————————————————————————————————-
নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ গত শতাব্দীর একজন ব্যাপক আলোচিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তাঁর সংকলিত বিশাল গ্রন্থ ‘সিলসিলাতুয যয়ীফা’ হাদিস বিশারদদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। স্বভাবতই এ নিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরও আগ্রহ কম নয়। ফতওয়া বিভাগগুলোতে এ বিষয়ে মানুষের বহু প্রশ্ন এসে থাকে। এমনি একটি প্রশ্ন এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে কিছুটা বিস্তারিতভাবে এর জবাব পেশ করা হল।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আলোচ্য বিষয়টি মূলত গবেষণামূলক ইলমী আলোচনা হওয়ায় প্রয়োজনের খাতিরেই লেখাটিতে ব্যাপকভাবে পারিভাষিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। -সম্পাদক
প্রশ্ন:………
বরাবর,ফতওয়া বিভাগ মারকাযুদ্দাওয়া আলইসলামিয়া ঢাকা……
৭৯/১এ, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪….
বিষয়: ‘যয়ীফ ও জাল হাদিস সিরিজ’ কিতাব ও কিতাবের মূল লেখক সম্পর্কে ফতওয়া বিভাগের মন্তব্য লিখিতভাবে জানার প্রসঙ্গে।
জনাব,…
প্রথমে আমার সালাম গ্রহণ করবেন। ফতওয়া বিভাগের মাধ্যমে আপনার নিকট উক্ত বিষয় সম্পর্কে জানার আবেদন করছি।….
উল্লেখ্য, ATN বাংলা টিভির ইসলামী অনুষ্ঠানে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কিতাবটির মূল লেখক সম্পর্কে খুব ভাল মন্তব্য করেছেন। তিনি এও বলেছেন যে, উক্ত লেখক নাকি আহলে আরব তথা আরব ভূখণ্ডের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন এবং ৬০এর দশকে তিনি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মুহাদ্দিস পদেও নাকি ছিলেন।
অতয়েব, মাওলানা সাঈদী সাহেবের তথ্যের ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ার কারণে কিতাবের মূল লেখক সম্পর্কে সঠিক বিষয় জানানোর জন্য আবেদন করছি।
(সঙ্গে কিতাবটিও সংযুক্ত হল।)
আবেদনকারী: মুহাম্মাদ রাইহান ১২৪, চকবাজার, ঢাকা, ৩১/০৩/২০০৪ঈ.
উত্তর:……
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. (মৃত্যু ১৪২০হি.) একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ ইলমে হাদীসের খেদমতে ব্যয় করেছেন। মানুষের মধ্যে সহীহ এবং যয়ীফ হাদিসের পার্থক্য নির্ণীত হোক, এ ব্যাপারে তিনি সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং আল্লাহ চাহে তো এজন্য তিনি আখেরাতে উত্তম বদলা পাবেন। ولا نزكي علي الله احدا তথাপি তাঁর সমসাময়িক মুহাক্কিক ন্যায়নিষ্ঠ আহলে ইলমের দৃষ্টিতে তাঁর রচনা ও গবেষণা কর্মের যেসব বিচ্যুতি ধরা পড়েছে তা থেকে চোখ বন্ধ রাখাও সমীচীন নয়। যথা-
(১). শায়খ আলবানী রহ. উলূমুল হাদীসের জ্ঞান এ বিষয়ের কোন বিজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি।
শায়খ আলবানী রহ.এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যাপারে এ বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত যে, তিনি উলূমুল হাদীসের জ্ঞান এ বিষয়ের কোন বিজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে নিজের অধ্যয়নই তাঁর মূল নির্ভর। অথচ শাস্ত্রীয় ব্যাপারে সর্বজন স্বীকৃত একটি মূলনীতি, অভিজ্ঞতাও যার সাক্ষ্য প্রদান করে তা এই যে, যেকোনো শাস্ত্রে পরিপক্বতা অর্জনের জন্য সে শাস্ত্রের পণ্ডিত ব্যক্তিদের সহচার্য লাভ করা জরুরী। ব্যক্তিগত অধ্যয়নে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে পারে কিন্তু শাস্ত্রীয় পরিপক্বতা কোন শাস্ত্রীয় পণ্ডিতের সহচার্য ছাড়া অর্জিত হওয়া বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব।
আমাদের জানা মতে হাদীস শাস্ত্রে আলবানী রহ.এর একজন মাত্র উস্তাদ আছেন। তাঁর কাছ থেকেও তিনি শুধু প্রথাগত ‘ইজাযত’ গ্রহণ করেছেন। তাঁর সহচার্য অবলম্বন করা, তাঁর নিকট থেকে শাস্ত্রীয় জ্ঞান লাভ করা, কোনটাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। (দেখুন: মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আজমী (মৃত্যু ১৪১২হি.) ‘আলআলবানী শুযূযুহু ওয়াআখতাউহু’ ১/৯; শায়খ মুহাম্মাদ আওওয়ামা, আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফিখতিলাফিল আইম্মাতিল ফুকাহা ৪৭)
এজন্য উলূমুল হাদীসের একজন সচেতন ছাত্রের কাছেও –যার কোন শাস্ত্রজ্ঞের সহচার্য লাভ হয়েছে- আলবানী সাহেবের এই দুর্বলতার প্রভাব তাঁর রচনাবলীতে অনেক স্থানেই প্রকটভাবে অনুভূত হয়। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলতে পারি। অনেক দীর্ঘ সময় শায়খ আলবানী রহ.এর রচনাবলি অধ্যয়ণের সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর রচনাবলীতে তথ্য ও উদ্ধৃতির প্রাচুর্য থাকলেও ইলমী গভীরতা কম বোধ হয়েছে। সূক্ষ্ম ও মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়াদিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর আলোচনা অগভীর সিদ্ধান্তে সমাপ্ত হয়। এ জাতীয় অনেক দৃষ্টান্ত মুহাক্কিকগণের লিখিত কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। এ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-নিবন্ধে সে সবের উদ্ধৃতি সম্ভব নয়; এজন্য আরবী ভাষা জানেন এমন পাঠক আমার রচনাধীন الشيخ الاالباني وكتابه سلسلة الضعيفة (আশ্শায়খ আল-আলবানী ওয়া-কিতাবুহু সিলসিলাতুয যয়ীফা) অধ্যয়ন করতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি নমুনা পেশ করছি:
(ক) سكتوا عنه শব্দটি ‘জারহে মুবহাম’ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। উলূমুল হাদীস এবং ‘জারহে তাদীল’এর সাথে জানাশোনা আছে এমন একজন ছাত্রও এ বিষয়টি বোঝে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে শব্দটি ‘জারহে মুফাসসার’ হওয়ার ঘোষণা দেন এবং এ ব্যাপারে এমন দলীল পেশ করেন যে, এতে শাস্ত্রজ্ঞদের ‘ইবারত’ বোঝার ব্যাপারে তাঁর অদক্ষতা ও দুর্বলতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে। (দেখুন সিলসিলাতুয যয়ীফা ১/৬৬২)
অথচ ‘জারহে মুব্হাম’, ‘জার্হে মুফাস্সার’ ও ‘জার্হে মুবারহান’-এর পার্থক্য নিরূপণে সক্ষম হওয়া শাস্ত্রের প্রাথমিক বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত।
(খ) ‘মুরসাল’এর পারিভাষিক ব্যবহার-সমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারায় এমন একটি হাদীসকে মুরসাল আখ্যা দিয়ে তাকে ‘যয়ীফ’ সাব্যস্ত করেছেন যা ‘সহীহ’ ও ‘মামূলবিহী’ হওয়ার ব্যাপারে ‘খাইরুল কুরূন’ এবং পরবর্তী সময়ে সমগ্র উম্মাহর ইজমা রয়েছে। এ বিষয়ে শায়খ আলবানীর মত জানার জন্য দেখুন তাঁর কিতাব ‘ইরওয়াউল গালীল’ ১/১৫৮ এবং হাদীসটির ব্যাপারে সমগ্র উম্মতের অবস্থান জানার জন্য দেখুন ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ.এর কিতাব ‘আলইসতিযকার’ ৮/১০
(গ) কোন কোন ব্যক্তি এই নীতি পেশ করেছেন, কেউ কেউ বাস্তবে তা অনুসরণও করেছেন যে, روي বা এ জাতীয় ‘সিগায়ে মাজহুল’ যয়ীফ বর্ণনার ক্ষত্রে ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু শায়খ আলবানী রহ. এ নীতির অর্থ এই নিয়েছেন যে, যিনিই কোন স্থানে ‘সিগায়ে মাজহুল’ ব্যবহার করেছেন তিনিই তা ‘যয়ীফ’ বোঝনোর জন্যই ব্যবহার করেছেন। এজন্য তিনি কিছু সহীহ হাদীসকে যয়ীফ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে এ প্রমাণ পেশ করেছেন যে, অমুক ইমাম হাদীসটি ‘সিগায়ে মাজহুল’ দ্বারা উল্লেখ করেছেন। অথচ এটি এমনই ত্রুটি যা একজন সচেতন ছাত্রের পক্ষেও মানানসই নয়। কেননা অসংখ্য সহীহ হাদীস এমন আছে যা বর্ণনা করার সময় কোন না কোন ইমাম বা মুহাদ্দিস ‘সিগায়ে মাজহুল’ ব্যবহার করেছেন। দেখুন আলবানী রহ.এর কিতাব ‘সালাতুত তারাবীহ’; মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আজমী রহ.এর ‘আলআলবানী শুযূযুহু ওয়াআখতাউহু’ ১/১৬-২০; শায়খ ইসমাঈল আনসারী রহ. রচিত ‘তাসহীহু হাদীসি সালাতিত তারাবীহ’ ২৩-২৪
এখানে কিছু নমুনা পেশ করা হল। অন্যথায় আমার কাছে আলবানী রহঃ এর এ জাতীয় অগভীর ও ত্রুটিপূর্ণ বক্তব্য ও মতামতের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি রয়েছে, যা এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়।
তবে এ ব্যাপারে সাধারণ কথা হল, তিনি অনেক ক্ষেত্রে উসূলে হাদিসের বিষয়াদিতে شرح نخبه (শারহে নুখবা) ও الباعث الحثيث (আলবায়িসুল হাসিস) এবং ‘জারহ তাদীল’এর বিষয়াদিতে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে ‘তাকরীবুত তাহযীব’এর উপর নির্ভর করাকেই যথেষ্ট মনে করেন এবং এতে তিনি কোন ধরণের দ্বিধাবোধ করেন বলে মনে হয় না। শাস্ত্রীয় তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এর চেয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতি আর কি হতে পারে?
চিন্তা করুন, একটি হাদিসকে তার নিজের ভাষ্য অনুসারে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারি, ইমাম আবু হাতেম রাযী, ইমাম ত্বহাবী, ইমাম ইবনে হিব্বান প্রমুখ ইমামগণ ‘সহীহ’ বলেছেন; কিন্তু তিনি হাদিসটিকে ‘যয়ীফ’ বলার ব্যাপারে যেন পণ করে বসেছেন। তার বক্তব্য হল হাদিসটির একজন বর্ণনাকারী হলেন শরীক বিন আব্দুল্লাহ আন্নাখয়ী। ‘তাকরিবুত তাহযীবে’ আছে তিনি سيء الحفظ এবং سيء الحفظ রাবীর হাদীসকে সহীহ বলা নিয়ম বহির্ভূত। আলবানী রহ. যেন ইমাম বুখারী রহ. সহ এ সকল হাদীস শাস্ত্রের প্রাণপুরুষদেরকে ‘শরহে নুখবা’ ও ‘তাকরীবুত তাহযীব’ পড়াচ্ছেন। তাঁদেরকে হাদীসশাস্ত্রের নিয়মনীতি শিখাচ্ছেন। বলা বাহুল্য হবে না যে, ‘জার্হ তাদীল’ ও উসূলুল হাদীস এবং ফিকহুল হাদীসের ব্যাপারে অগভীর জ্ঞানই এ ধরণের প্রগলভতার একমাত্র কারণ। দেখুন সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা ২/৩৬২-৩৬৪
(২) . ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’ এর ব্যাপারে শায়খ আলবানী রহ. এর অনুসৃত নীতি
শায়খ আলবানী রহ. ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত নীতি আলোচ্য কিতাবের শুরুতে এভাবে উল্লেখ করেছেন-
ومما ينبغي أن يُذكر بهذه المناسبة أنني لا أقلد أحداً فيما أصدِرُه من الأحكام على تلك الأحاديث، وإنما أتَّبِع القواعد العلمية التي وضعها أهل الحديث، وجرَوا عليها في إصدار أحكامهم على الأحاديث من صحة أو ضعف
ج:١، ص:٤٢
الكتاب: سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة وأثرها السيئ في الأمة المؤلف: أبو عبد الرحمن محمد ناصر الدين، بن الحاج نوح بن نجاتي بن آدم، الأشقودري الألباني (المتوفى: 1420هـ) دار النشر: دار المعارف، الرياض – الممكلة العربية السعودية الطبعة: الأولى، 1412 هـ / 1992 م عدد الأجزاء: 14 [ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
অর্থাৎ, তিনি সহীহ-যয়ীফ নির্ণয়ের ব্যাপারে পূর্ববর্তী হাদিস বিশারদ ইমাম বা পরবর্তী হাফিযুল হাদিস গনের কারো অনুসরণ করেন না; বরং আইম্মায়ে হাদীস যে নীতমালার আলোকে হাদীসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন, তিনিও সেসবের অনুসরণ করবেন এবং সরাসরি ওই সব নীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন।
প্রশ্ন হয় যদি হাদিস বিশারদ ইমামগণের নীতিমালা অনুসরণ করা বৈধ হয়, তবে সেই সব নীতির আলোকে গৃহীত তাদের সিদ্ধান্ত সমূহের তাকলীদ করা এমন কি দোষের ব্যাপার যে তা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিতে হয়েছে? অথচ একথা বলাই বাহুল্য যে, যারা এই সব নীতি নির্ধারণ করেছেন, তারাই এর হাকীকত ও প্রয়োগের ব্যাপারে অধিকতর জ্ঞাত।
দ্বিতীয়ত, শায়খ আলবানী রহ. কি হাদিস শাস্ত্রে এই পরিমাণ পাণ্ডিত্য ও পরিপক্বতা অর্জন করেছিলেন, যার ভিত্তিতে আইম্মায়ে কিরামের সিদ্ধান্তসমূহকে পরিত্যাগ করে নিজস্ব বিচার বিবেচনা মোতাবেক সেই সব নীতিমালা প্রয়োগের অধিকার তাঁর জন্মেছে? শাস্ত্রের প্রাণপুরুষ ইমাম –যাঁদের বক্তব্য ও বাস্তব প্রয়োগ থেকেই শাস্ত্রের কায়দাকানুন তৈরি হয়- তাঁদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তসমূহের তোয়াক্কা নয়া করে তাদের ‘নিয়ম’ অনুসরণের ভাওতায় নিজস্ব বিভার-বিবেচনা প্রসূত স্বেচ্ছাচারী ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে, তাকে পূর্ববর্তী ইমামগণ এমন কি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের সাথেও মতানৈক্যে লিপ্ত হতে হয়েছে। সহীহ মুসলিমের প্রায় বিশ বা ততোধিক হাদীসকে তিনি যয়ীফ বলেছেন এবং সহীহ বুখারীর বেশ কিছু হাদীসকেও সরাসরি ‘যয়ীফ’ বা ‘মুনকার’ বলে দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ দেখুন সহীহ বুখারীর ২১১৪ ও ২৮৫৫ নং হাদীস। এ দুটি হাদীসকে ‘যয়ীফুল জামিয়িস্ সগীর’ ২৫৭৬ ও ৪৪৮৪ নম্বরে যয়ীফ বলেছেন। সহীহ মুসলিমের যেসব হাদীসকে যয়ীফ বলেছেন, তার আলোচনা تنبيه المسلم إلي تعدي الألباني علي صحيح مسلم (তাম্বীহুল মুসলিমি ইলা তাআদ্দিল আলবানী আলা সহীহি মুসলিম)-এ বিদ্যমান রয়েছে। এতে শায়খ আলবানী রহ. এর সিদ্ধান্তের ভ্রান্তি বরং তার দালীলিক আলোচনা পাওয়া যাবে।
যখন এই দুই ইমাম এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব দুটির ব্যাপারেই তাঁর অনুসৃত নীতি ও আচরণ এই, তখন অন্যদের ব্যাপারে তাঁর আচরিত নীতির কথা বলাই বাহুল্য।
তৃতীয়ত, যে বিষয়টি এ প্রসঙ্গে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ‘উলূমুল হাদীসের; মাঝারি মানের একজন ছাত্রও জানে যে, হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয় করা হাদীস বর্ণনাকারী রাবীগণের অবস্থা ও অবস্থানের নিরিখে তাদের পর্যায় নির্ধারণ করা, এক কথায় ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’ ও ‘জারহ্-তাদীল’এর বহু বিষয় এমন রয়েছে যা খোদ হাদীস বিশারদ ইমামগণের মধ্যেও মতভেদপূর্ণ। প্রশ্ন হয়, এ জাতীয় ক্ষেত্রে শায়খ আলবানী কোন মত বা পথ অবলম্বন করবেন? এ প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তর তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায় নয়া। অথচ বিষয়টি অস্পষ্ট ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল না।
অপর দিকে তাঁর বাস্তব কর্মক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে কোন ন্যায়নিষ্ঠ পাঠকের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। কেননা এ জাতীয় একাধিক মতপূর্ণ নীতিমালাতে তিনি নির্দিষ্ট কোন অবস্থানে স্থির নন। কোথাও একমত অবলম্বন করেন, অন্যত্র অপর মত। যেমন ‘মাসতূর’-এর হাদীস হুজ্জত হবে কিনা; ইব্ন হিব্বানের ‘তাওসীক’ গ্রহণযোগ্য কিনা; হাদীসের ‘তাসহীহ’ দ্বারা রাবীর ‘তাওসীক’ হয় কিনা; ‘যিয়াদাতুস সিকাত’ গ্রহণযোগ্য কিনা ইত্যাদি বিষয়ে শায়খ আলবানী রহ. অনেক যায়গায় স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ রচিত التعريف بأوهام من قسم السنن إلي صحيح و ضعيف (আত্তারিফ বিআওহামি মান কসামাস সুনানা ইলা সহীহিউ ওয়া যয়ীফ) ১/২৫ এবং কিতাবের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আলোচনা।
চতুর্থত, হাদীসের ‘সহীহ-যয়ীফ’ নির্ণয়ের জন্য সর্ব প্রথম যে বিষয়গুলো জানতে হয় তার মধ্যে ‘জারহ-তাদীল’ তথা হাদীস বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ের ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করা অন্যতম এবং এরই ভিত্তিতে রাবীদের স্থান ও পর্যায় নির্ণীত হয়, যা ছাড়া হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয় করা কখনো সম্ভব নয়। প্রশ্ন হল, শায়খ আলবানী রহ. যখন হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয়ের ব্যাপারে কারো তাকলীদ না করার ঘোষণা দিয়েছেন তখন রাবীর জার্হ-তাদীলের ব্যাপারে তাঁর অবস্থান কি হবে? তিনি কি এক্ষেত্রে আইম্মায়ে হাদীসের তাকলীদ করবেন, নাকি জার্হ-তাদীলের নীতিমালার আলোকে হাজার বছর আগের রাবীদের সত্যবাদীতা, স্মৃতি শক্তি এবং এ ধরণের আরো হাজারো বিষয়ের যাচাই সরাসরি নিজেই করবেন। এরপর রাবীদের স্থান ও পর্যায় নিরূপণ করবেন? এ প্রশ্নটির স্পষ্ট কোন উত্তর তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায় না। তবে তাঁর বাস্তব কর্ম-ক্ষেত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনি কার্যত ‘জারহ্-তাদীলের’ ব্যাপারে সাধারণত তাকলীদই করে থাকেন।
প্রশ্ন হয় রাবীর জার্হ-তাদীলের ব্যাপারে ইমামগণের তাকলীদ করা যাবে আর হাদীসের ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ক্ষেত্রে তাঁদের তাকলীদ করা যাবে না- এই দ্বৈত নীতির যৌক্তিক কোন কারণ থাকতে পারে কি?
এছাড়া এখানে আরো আফসোসের ব্যাপার হল, শায়খ আলবানী রহ. রাবীদের জার্হ তাদীলের ব্যাপারে তাকলীদ করলেও সেটাকে যথাযথ তাকলীদ বলাও কঠিন। কেননা তিনি সাধারণত ‘আসমাউর রিজাল’ ও ‘জার্হ তাদীল’এর সংক্ষিপ্ত কিতাবাদির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দিয়ে বসেন অথবা দুএকটি মাঝারি ধরণের কিতাবের ভিত্তিতেই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যান। বলা বাহুল্য, তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় অবস্থান নিঃসন্দেহে ছেলেমীপনা।
অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, তিনি শুধু ‘তাকরীবুত তাহযীব’, ‘খুলাসা’ বা ‘মীযানুল ই’তিদাল’ ইত্যাদি কিতাবের উপর নির্ভর করেই কোন রাবীকে ‘মাজহুল’ বা ‘যয়ীফ’ আখ্যায়িত করেছেন এবং এরই ভিত্তিতে অনেক হাদীসকে ‘যয়ীফ’ আখ্যা দিয়েছেন অথচ তিনি যদি ‘জারহ-তাদীল’এর বিস্তারিত ও দীর্ঘ কিতাবসমূহের সাহায্য নিতেন তবে দেখতেন যে, এসব রাবী গ্রহণযোগ্য এবং তাদের বর্ণিত ওই সকল হাদীসও সহীহ এবং তিনি বুঝতে পারতেন যে, এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী ইমামগণের বক্তব্যই সঠিক।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকজন রাবীর কথা আলোচিত হল:
১. ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্ব’
‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্ব’ এর ব্যাপারে মিশকাতের টীকায় (৩/১৫০০) শায়খ আলবানী রহ. লিখেছেন “তিনি মাজহুল”। দলীল হিসেবে বলেছেন, ‘খুলাসা’তে তাঁর ব্যাপারে জার্হ-তাদীলের ইমামগণের কারো বক্তব্য উদ্ধৃত হয়নি।
অথচ ‘খুলাসা’র মত সংক্ষিপ্ত কিতাব কেন, আসমাউর রিজালের দশ-বিশটি দীর্ঘ কিতাবেও যদি কারো ব্যাপারে আলোচনা না পাওয়া যায় এবং তার ব্যাপারে কারো সিদ্ধান্ত না পাওয়া যায় তবে তাকে ‘মাজহুল’ আখ্যা দেওয়ার অধিকার শায়খ আলবানী কেন অষ্টম শতাব্দীর হাফিয যাহাবী রহ.এর মত ব্যক্তিত্বেরও নেই। (লিসানুল মীযান ৯/৭৯, তরজমা নং ৮৮৭৭ দ্রষ্টব্য)
অথচ শায়খ আলবানী শুধু এই দলীলে যে, ‘খুলাসা’তে ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্ব’এর ব্যাপারে কোন মন্তব্য বিদ্যমান নেই, তাকে মাজহুল আখ্যা দিচ্ছেন। খোদার বান্দা যদি ‘খুলাসা’র সাথে আরো দুএকটি কিতাবের পাতা ওল্টানো পর্যন্তও ধৈর্য ধরতেন তবুও না হয় একটা কথা হত।
আফসোসের ব্যাপার হল, ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্ব’ সাধারণ কোন রাবী নন, তিনি রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ছিলেন। فرضى الله عنه وعن جميع الصحابة أجمعين তাঁর ব্যাপারে আলোচনা তারাজিমুস সাহাবা (সাহাবীগণের জীবন-চরিত অভিধান) বিষয়ক কিতাবাদিতে বিদ্যমান রয়েছে। দেখুন, আল ইসাবা ৪/৯৫, ‘উসদুল গাবাহ ২/৬০০।
শায়খ আলবানী রহ. যদি অন্তত ‘তাহযীবুত তাহযীব’ (৫/২১৮) বা ‘তাকরীবুত তাহযীব’ (৩৬০) পড়ে নিতেন তবুও এই মারাত্মক ভ্রান্তিতে নিপতিত হতেন না।
২. ‘ইয়াহইয়া বিন মালিক আলআযদী আবু আইয়ূব আলমারাগী’
তিনি একজন তাবেয়ী এবং সহীহ মুসলিমের একজন রাবী। নাসায়ী, ইব্ন হিব্বান, ইজলী, ইব্ন সা’দ প্রমুখ তাকে ‘সিকা’ বলেছেন। কিন্তু শায়খ আলবানী রহ. মিশকাতের টীকায় (১/৪৩৮) একটি সনদের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন, “ইয়াহ্ইয়া ইবন্ মালিক আলআযদী ছাড়া সনদের সকল রাবী ‘সিকা’।”
ইয়াহ্ইয়া ইবন্ মালিক কেন ‘সিকা’ নন? এর উত্তরে তিনি বলেন, “তার ব্যাপারে ‘কিতাবুল জার্হ ওয়াত তাদীল’ (৪২/১৯০)এ কোন মন্তব্য উল্লেখ নেই।” ব্যাস এক কিতাবেই তাহকীক শেষ হয়ে গেল। অথচ তিনি ‘তাহযীবুত তাহযীব’ ও ‘তাকরীবুত তাহযীব’ ইত্যাদি কিতাবেও তার আলোচনা পড়ে নিতেন তবে এই তাবেয়ীকে অন্যান্য ‘সিকা রাবী’ থেকে বিচ্ছিন্ন করতেন না।
৩. ‘সাঈদ বিন আশওয়া’
শায়খ আলবানী রহ. إروإء الغليل (ইরওয়াউল গলীল) কিতাবে (৩/১২১) সাঈদ বিন আশওয়া এর ব্যাপারে বলেন, “আমি তার তরজমা বা আলোচনা পাইনি”। অথচ তাঁর আলোচনা ‘তাহযীবুত তাহযীব’ (৪/৬৭), ‘তাকরীবুত তাহযীব’’ (২৮৫) ছাড়াও আরো কিতাবেই রয়েছে। তাছাড়া তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মত প্রসিদ্ধ কিতাব দুটির রাবী। তাঁর পুরো নাম সাঈদ বিন আমর বিন আশওয়া।
মোটকথা এ এক লম্বা ফিরিস্তি। এক দুই কিতাবের দুচার পৃষ্ঠা উল্টিয়েই কোন ‘সিকা’ বা ‘মারূফ’ রাবীকে, ‘যয়ীফ’ বা ‘মাজহুল’ বলে দেওয়া; তেমনি এক দুই কিতাব থেকে কোন ইমামের সিদ্ধান্ত অপূর্ণভাবে উল্লেখ করে, রাবীর ব্যাপারে ভুল মন্তব্য করা বা যথাযথভাবে রাবীর আলোচনা তালাশ না করেই ‘তার আলোচনা পেলাম না’ বলে দেওয়া ইত্যাদির বহু দৃষ্টান্ত শায়খ আলবানীর রচনাবলীতে পাওয়া যায়।
লজ্জার ব্যাপার হল, যখন তাঁকে এসব বিষয়ে সতর্ক করা হল তখন তাঁর অতিভক্ত লোকেরা তাঁর পক্ষ থেকে এই ওযর পেশ করল যে, “শায়খের ‘নাশাত’ হয়নি।” (অর্থাৎ, অনেক কিতাব থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তাহকীক করতে তাঁর তবীয়তে চায়নি।) এজন্য তিনি ‘তাকরীবুত তাহযীব’এর উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন। দেখুন, আলী আল হালাবী রচিত إحكام المبانى (ইহ্কামুল মাবানী) ৩৬, ৪১, ৭৬।
এই ওযরখাহি থেকে এছাড়া আর কি অর্থ বের হয় যে, শায়খ আলবানী রহ. তাহকীক করা ছাড়াই তাঁর ‘তবীয়তসম্মত’ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন; যদিও সিদ্ধান্তটি পূর্ববর্তী ইমামগণের বিরোধীই হোক না কেন। লড়াই হবে ফন ও শাস্ত্রের ইমামগণের সাথে আর হাতিয়ার হবে ‘তাকরীবুত তাহযীব’ বা তারও পরের কোন কিতাব! কী অদ্ভুত ব্যাপার!
(চলবে)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন